মূত্রথলির ক্যান্সার (Bladder Cancer)

জুলাই মূত্রথলির ক্যান্সার সচেতনতা মাস

কিডনিতে (kidney) তৈরি হওয়া মূত্র ইউরেটার (ureter) বেয়ে নেমে এসে জমা হয় মূত্রথলিতে (bladder)। থলি পূর্ণ হলে একসময় শরীর সংকেত দেয় প্রস্রাব করার। মূত্রনালীর (Urethra, ইউরেথ্রা) মাধ্যমে মূত্রথলি থেকে প্রস্রাব শরীর থেকে বের হয়।

URINARY TRACT SYSTEM

মূত্রথলির দেয়াল ট্রানজিশনাল সেল (transitional cell) নামে একধরনের বিশেষ কোষ বা সেল দিয়ে তৈরি। প্রায় ৯৫% ক্ষেত্রে মূত্রথলির ক্যান্সারের উৎপত্তি হয় এ সেল থেকে। এ ধরনের ক্যান্সারের তাই নামকরণ করা হয়েছে ট্রানজিশনাল সেল কার্সিনোমা। 

মূত্রথলির ক্যান্সারের আচরণ আগ্রাসী ধরনের (ম্যালিগন্যান্ট টিউমার) তা হতে পারে ছোট বা বড় আকারের, মূত্রথলির দেয়াল ভেদ করতে পারে, ছড়িয়ে পড়তে পারে শরীরের অন্যান্য অংশে (মেটাস্ট্যাসিস)

ট্রানজিশনাল সেল কার্সিনোমা ছাড়াও আরও দুই ধরনের মূত্রথলির ক্যান্সার রয়েছে: স্কোয়ামাস কারসিনোমা (squamous carcinoma) এবং এডেনোকার্সিনোমা (adenocarcinoma)। ট্রানজিশনাল সেল কার্সিনোমার মতো এদেরও আকার ছোট বা বড় হতে পারে, মেটাস্ট্যাসিস হতে পারে। সাধারণত ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে এ ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের ঝুঁকি বেশি।

কেন হয়?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূত্রথলির ক্যান্সারের কারণ অজানা। তবে ধূমপানকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। ডাই, টেক্সটাইল, টায়ার, রাবার, পেট্রোলিয়াম ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলেও হতে পারে মূত্রথলির ক্যান্সার।

লক্ষণ উপসর্গ

ক্যানসার আকারে ছোট হলে সাধারণত কোন লক্ষণ থাকে না। কিন্তু প্রস্রাবের সাথে রক্ত, গাঢ় বা লালচে রঙের প্রস্রাব দেখা যেতে পারে। প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, বারবার অল্প পরিমাণে প্রস্রাব করার তাগিদও ক্যানসারের সাথে সম্পর্কিত উপসর্গ হতে পারে।
ক্যানসার আকারে বড় হলে লক্ষণ উপসর্গ বেশি স্পষ্ট হতে থাকে। অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি তলপেটে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া দেখা দিতে পারে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

  • ডাক্তার শুরুতে Urine Routine Test (Urine RE) নামে প্রস্রাব্রের একটি টেস্ট দিবেন। এটি খুব সহজে যেকোন ল্যাবে করা যায়, খরচও তুলনামূলক কম। প্রস্রাবে রক্ত, ইনফেকশন, কোন কোন ক্ষেত্রে ক্যানসার সেল ধরা পড়ে। ইউরিন টেস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছোট আকারের ক্যানসারের ক্ষেত্রে শুরুতে উপসর্গ মৃদু থাকে বা অনুপস্থিত থাকে বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউরিন টেস্টেই দেখা যায় ক্যানসারের প্রথম সংকেত।
  • রেচনতন্ত্রের (কিডনি, ইউরেটার, ব্লাডার, ইউরেথ্রা) কোথায় গণ্ডগোল হলো বোঝার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasonography), সিটি স্ক্যান (Computed Tomography) টেস্ট করার পরামর্শ দিবেন।
  • সিস্টোস্কোপি (cystoscopy) নামে এক ধরনের টেস্টের প্রয়োজন হতে পারে। একটি সরু টিউবের মাথায় ক্যামেরা দিয়ে মূত্রথলির ভেতরের অংশ দেখা হয়। অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেলে সেখান থেকে টিসু স্যাম্পল (ডাক্তারি ভাষায় বায়োপসি স্পেসিমেন) নেয়া হয় পরবর্তীতে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষার জন্য।

মূত্রথলির ক্যানসারের চিকিৎসা কীভাবে করা হয়?

ক্যানসারের ধরন এবং মেটাস্ট্যাসিস হয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

  • ছোট ও মাঝারি আকারের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপিক সার্জারি করে ক্যানসারে আক্রান্ত জায়গা সরিয়ে ফেলা হয়।
  • বড় আকারের ক্যানসারের ক্ষেত্রে পুরো মূত্রথলি অপারেশন করে বাদ দিতে হতে পারে। একে বলে রেডিক্যাল সিস্টেক্টোমি (radical cystectomy)।
    প্রশ্ন আসতে পারে, মূত্রথলি বাদ দিলে প্রস্রাব জমা হবে কোথায়? এ অপারেশনের পর চামড়ার নিচ দিয়ে ইউরেটারের বিশেষ সংযোগ করা হয় (urostomy)। শরীরের বাইরের অংশে ইউরোস্টোমি ব্যাগ (urostomy bag) বলে পরিচিত এক ধরনের ব্যাগ বা পাউচে প্রস্রাব জমা হতে থাকে। ইউরোস্টোমির পর বিভিন্ন ধরনের সতর্কতা, ব্যবহারবিধি জেনে নিতে হবে। নিচের ভিডিওটি সহায়ক হবে।

  • অপারেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যথানাশক, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।

মূত্রথলির ক্যানসার ধরা পড়লে কী করবেন, কী করবেন না

  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করবেন।
  • সেক্সুয়াল রিলেশন-সহ অন্যান্য স্বাভাবিক কাজকর্মে কখন ফিরে যেতে পারবেন তা ডাক্তার থেকে জেনে নিবেন।
  • সার্জারির আগে-পরে পিঠে ব্যথা, জ্বর, বমিভাব, বমি হলে সার্জনের সাথে যোগাযোগ করুন।
  • প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলে, বারবার প্রস্রাব করার প্রয়োজন হলে, প্রস্রাবের সময় ব্যথা অনুভব করলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে দেরি করবেন না।
  • সার্জারির পর মূত্রনালী উত্থিত (ইরেকশন, erection) হতে গেলে ব্যথা বা সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • সিস্টোস্কোপির পর অতিরিক্ত রক্তপাত, জ্বর, শীত শীত অনুভব হলে ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন।
  • ধূমপান মূত্রথলির ক্যানসারের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর। তাই ধূমপানের অভ্যাস থাকলে এখনি পরিত্যাগ করুন।
  • সফল চিকিৎসার পরও নতুন করে ক্যানসার সেল দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে হতাশ হওয়া যাবে না। নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
  • অপারেশনের পর প্রথম এক বছর নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে। কখনো এপয়েন্টমেন্ট মিস করা যাবে না।

 

 

Dr Omar Faruq MBBS BCS (Health)

Add comment